বাংলাদেশের রাজনীতি কি কখনো বদলাবে? বলির পাঁঠা কেন সাধারণ জনগণ
বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে দীর্ঘদিনের একটি প্রশ্ন রয়েছে—রাজনীতি কি সত্যিই মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য, নাকি ক্ষমতা অর্জন ও ক্ষমতা ধরে রাখার প্রতিযোগিতায় সাধারণ মানুষের স্বার্থ অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়? রাজনৈতিক পরিবর্তন, নতুন প্রতিশ্রুতি, ক্ষমতার পালাবদল এবং নানা বিতর্কের মধ্যে একজন সাধারণ নাগরিকের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। তিনি চান একটি স্থিতিশীল জীবন, ন্যায্য আয়, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, মানসম্মত শিক্ষা, সাশ্রয়ী চিকিৎসা এবং সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ।
কিন্তু যখন রাজনৈতিক বিরোধ, সংঘাত, অনিশ্চয়তা কিংবা ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে, তখন প্রশ্ন ওঠে—এই ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত অবস্থান কোথায়? জনগণ কি রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে, নাকি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের বাইরে পড়ে থাকা একটি অবহেলিত অংশ?
রাজনীতি চলবে, কিন্তু জনগণের ভাগ্য কি বদলাবে?
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনীতি স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় বিষয়। রাষ্ট্র পরিচালনা, নীতিনির্ধারণ, নাগরিক অধিকার রক্ষা এবং জনসমস্যার সমাধানে রাজনৈতিক কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মতের পার্থক্য থাকবেই, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাও থাকবে। তবে সেই প্রতিযোগিতার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জনকল্যাণ নিশ্চিত করা।
সমস্যা তৈরি হয় যখন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। ক্ষমতা অর্জনের আলোচনা সামনে থাকলেও কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে কার্যকর অগ্রগতি স্পষ্ট না হলে হতাশা বাড়ে। তখন অনেকের মনে হয়, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালেও তাদের ব্যক্তিগত জীবনের সমস্যাগুলো একই জায়গায় রয়ে গেছে।
বাস্তব পরিবর্তন শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তনে আসে না। পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন কার্যকর প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহি, আইনের সমান প্রয়োগ, স্বচ্ছতা এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। জনগণকে কেন্দ্র করে নীতিনির্ধারণ না হলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
বলির পাঁঠা কেন সাধারণ জনগণ?
রাজনৈতিক বিতর্কে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগকে অনেক সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হিসেবে দেখা যায় না। অথচ রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সংঘাতের প্রভাব সবচেয়ে সরাসরি অনুভব করতে পারেন দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবার, চাকরিপ্রার্থী তরুণ এবং সীমিত আয়ের কর্মজীবী মানুষ।
একজন দিনমজুরের এক দিনের আয় বন্ধ হয়ে গেলে পরিবারের খাবার, বাসাভাড়া কিংবা সন্তানের পড়াশোনার খরচে সমস্যা তৈরি হতে পারে। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর দোকানে ক্রেতা কমে গেলে তাঁর সংসারের হিসাব এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। একজন চাকরিপ্রার্থী তরুণের জন্য অনিশ্চিত পরিবেশ নতুন সুযোগের পথ কঠিন করে তুলতে পারে।
এই মানুষগুলো সাধারণত ক্ষমতার প্রতিযোগিতার নিয়ন্ত্রক নন। কিন্তু বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, সংঘাত বা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব তাঁদের জীবনেই দ্রুত এসে পড়ে। এ কারণেই জনগণের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে রাজনৈতিক হিসাবের শেষ পর্যন্ত ক্ষতিটা তাঁদেরই বহন করতে হয়।
তবে সব রাজনৈতিক পরিবর্তন বা বিরোধের ফল এক রকম নয়। কোনো নীতি মানুষের উপকার করতে পারে, আবার কোনো সিদ্ধান্তের কারণে মানুষ ক্ষতিগ্রস্তও হতে পারে। তাই প্রয়োজন আবেগের পাশাপাশি বাস্তব ফলাফল যাচাই করা এবং জনস্বার্থের ভিত্তিতে প্রতিটি সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন করা।
দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়: রাজনীতির আলোচনায় সাধারণ মানুষের বাস্তবতা
সাধারণ পরিবারের কাছে রাজনীতির গুরুত্ব অনেকাংশে নির্ভর করে তাদের দৈনন্দিন জীবনে কী পরিবর্তন আসছে তার ওপর। বাজারে চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, শাকসবজি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে সীমিত আয়ের মানুষের বাজেট সংকুচিত হয়ে যায়। বাড়িভাড়া, যাতায়াত, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয়ও সংসারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
আয় যদি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে না বাড়ে, তাহলে একটি পরিবারকে প্রয়োজনীয় খরচ কমাতে হয়। কেউ পুষ্টিকর খাবার কম কেনেন, কেউ চিকিৎসা পিছিয়ে দেন, আবার কেউ সন্তানের শিক্ষা বা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে পারেন না। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে মানুষের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বাস্তব জীবনে সমস্যার সমাধান হচ্ছে কি না।
দ্রব্যমূল্যের পেছনে উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থা, আমদানি ব্যয়, বাজার প্রতিযোগিতা, পরিবহন এবং নীতিগত সিদ্ধান্তসহ বিভিন্ন কারণ কাজ করতে পারে। তাই কার্যকর সমাধানের জন্য প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ, বাজার তদারকি, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং অসাধু কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা।
বেকারত্ব ও তরুণ প্রজন্মের হতাশা
বাংলাদেশের তরুণদের একটি বড় প্রত্যাশা হলো যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পাওয়া। শিক্ষাজীবন শেষ করে একজন তরুণ যখন দীর্ঘদিন চাকরি খুঁজেও উপযুক্ত কর্মসংস্থান পান না, তখন তাঁর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। পরিবারের প্রত্যাশা, আর্থিক চাপ এবং সামাজিক তুলনা সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
কর্মসংস্থান শুধু ব্যক্তিগত আয়ের বিষয় নয়; এটি পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা, আত্মসম্মান, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং দেশের উৎপাদনশীলতার সঙ্গেও যুক্ত। যোগ্য তরুণদের জন্য স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া, দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং বেসরকারি খাতে মানসম্মত চাকরি তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে তাই নাগরিকদের প্রত্যাশা হওয়া উচিত স্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা, বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং ফলাফল প্রকাশ। শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, কত কর্মসংস্থান তৈরি হলো, চাকরির মান কেমন, নতুন উদ্যোক্তারা কী সুবিধা পেলেন এবং নিয়োগে স্বচ্ছতা কতটা নিশ্চিত হলো—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান
রাজনৈতিক বক্তব্যে উন্নয়ন, পরিবর্তন, অধিকার এবং সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি প্রায়ই গুরুত্ব পায়। কিন্তু নাগরিকদের জন্য মূল বিষয় হলো সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। একটি প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছে কি না, কত মানুষের উপকার হয়েছে এবং কোনো নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হয়েছে কি না—এসব যাচাই করার সুযোগ থাকা দরকার।
জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জনগণ শুধু ভোট দেওয়ার সময় গুরুত্বপূর্ণ নয়; রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি পর্যায়ে তাঁদের মতামত, অধিকার এবং প্রয়োজন বিবেচিত হওয়া উচিত। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি প্রকাশ, সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা, স্বাধীন গণমাধ্যমের কাজের সুযোগ এবং নাগরিকদের প্রশ্ন করার অধিকার এই প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতে পারে।
কোনো রাজনৈতিক পক্ষের বক্তব্যকে যাচাই ছাড়াই সত্য ধরে নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি প্রমাণ ছাড়া অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে প্রচার করাও দায়িত্বশীল আচরণ নয়। তথ্য যাচাই, নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং যুক্তিনির্ভর আলোচনা রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আরও সুস্থ করতে পারে।
সুশাসন ও আইনের সমান প্রয়োগ কেন জরুরি?
সুশাসন বলতে শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রম বোঝায় না। এর মধ্যে রয়েছে আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, নাগরিক অধিকার এবং সরকারি সেবার মান। রাষ্ট্রের নিয়মকানুন যদি সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয় এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের সুযোগ থাকে, তাহলে নাগরিকদের আস্থা বাড়ার পরিবেশ তৈরি হয়।
দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—উভয়ের অধিকার রক্ষা করে নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন করা উচিত। একইভাবে সরকারি সেবা পেতে হয়রানি, অযৌক্তিক বিলম্ব কিংবা অনিয়মের অভিযোগ থাকলে কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
সুশাসনের সুফল সাধারণ মানুষ সরাসরি অনুভব করেন যখন সরকারি অফিসে সেবা পেতে অযথা হয়রানি কমে, যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ হয়, সরকারি অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় এবং অন্যায়ের প্রতিকার চাওয়ার বাস্তব সুযোগ থাকে।
রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিভাজনের মূল্য কে দেয়?
রাজনৈতিক মতপার্থক্য একটি সমাজের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু মতের পার্থক্য যদি হুমকি, সহিংসতা, প্রতিহিংসা বা সামাজিক বিভাজনে রূপ নেয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় নাগরিকদের নিরাপত্তা ও পারস্পরিক আস্থা। পরিবারে উদ্বেগ বাড়ে, ব্যবসায় অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।
একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক পরিবেশে ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, নিরাপত্তা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের গুরুত্ব স্বীকার করা হয়। মতবিরোধের সমাধান হওয়া উচিত আলোচনা, যুক্তি, আইন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
দেশের সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে একে অপরের শত্রু হয়ে উঠুক—এটি কোনো সুস্থ সমাজের কাম্য হতে পারে না। নাগরিক হিসেবে সবার আগে প্রয়োজন নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপনের সুযোগ।
জনগণের দায়িত্ব কি শুধু ভোট দেওয়া?
একটি রাষ্ট্রে নাগরিকের ভূমিকা শুধু ভোট দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নাগরিকদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা, নীতিনির্ধারণ নিয়ে প্রশ্ন করা, নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই করা, স্থানীয় সমস্যার সমাধানে অংশ নেওয়া এবং আইনসম্মত উপায়ে মত প্রকাশ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো খবর বা অভিযোগ দেখলে সেটি যাচাই না করে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। পুরোনো ছবি, সম্পাদিত ভিডিও, ভুয়া উদ্ধৃতি কিংবা অসমর্থিত দাবি মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। তাই সংবাদ প্রকাশের তারিখ, মূল সূত্র, একাধিক নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন এবং প্রাসঙ্গিক প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।
নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ ও তথ্যভিত্তিক অংশগ্রহণ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে এর পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজেরও নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করা জরুরি।
বাংলাদেশের রাজনীতি বদলাতে কী কী প্রয়োজন?
রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়ন এক দিনে সম্ভব নয়। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন। কয়েকটি ক্ষেত্র বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ:
- জনগণের সমস্যা অগ্রাধিকার: রাজনৈতিক কর্মসূচিতে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দ্রব্যমূল্য ও সামাজিক নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া।
- স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি: নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, সরকারি ব্যয় ও নীতির ফলাফল সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করা।
- আইনের শাসন: অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনানুগ প্রক্রিয়ায় সবার অধিকার নিশ্চিত করা।
- দুর্নীতি প্রতিরোধ: সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অনিয়মের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর তদারকি ও অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
- কর্মসংস্থান সৃষ্টি: দক্ষতা উন্নয়ন, নতুন শিল্প, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং উদ্যোক্তাদের জন্য বাস্তবসম্মত সুযোগ বাড়ানো।
- মতপ্রকাশের স্বাধীনতা: শান্তিপূর্ণ ও দায়িত্বশীলভাবে মত প্রকাশ এবং তথ্য যাচাইয়ের পরিবেশ নিশ্চিত করা।
- সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি: ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে না দেখে যুক্তি ও আলোচনার মাধ্যমে মতপার্থক্য সমাধান করা।
- নাগরিক সেবার মান: স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা এবং সরকারি সেবা সহজলভ্য ও জবাবদিহিমূলক করা।
এসব উদ্যোগের সাফল্য বিচার করতে হবে বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে। কোনো ঘোষণা বা স্লোগান নিজে থেকেই পরিবর্তনের নিশ্চয়তা দেয় না; প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত মূল্যায়ন।
রাজনীতি কি কখনো জনগণের কল্যাণের হাতিয়ার হবে?
রাজনীতিকে সম্পূর্ণভাবে বাদ দিয়ে আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের বাজেট, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, অবকাঠামো এবং নাগরিক অধিকার—প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই নীতিনির্ধারণের প্রয়োজন রয়েছে। তাই প্রশ্নটি রাজনীতি থাকবে কি না, তা নয়; বরং রাজনীতি কীভাবে পরিচালিত হবে এবং এর সুফল কারা পাবেন, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
যে রাজনৈতিক পরিবেশে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার এবং নাগরিক অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেখানে রাজনীতি জনকল্যাণের কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। অন্যদিকে, জবাবদিহি দুর্বল হলে এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতায় জনস্বার্থ আড়ালে পড়ে গেলে নাগরিকদের হতাশা বাড়তে পারে।
এই বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের উচিত রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি নীতি, কাজ এবং ফলাফল পর্যবেক্ষণ করা। কে কী বলছেন, তার পাশাপাশি কী করেছেন, কোন প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।
উপসংহার: বলির পাঁঠা নয়, জনগণই হোক রাজনীতির কেন্দ্র
বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের হতাশা, প্রত্যাশা ও প্রশ্নকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। একজন নাগরিক রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে একজন মানুষ—তাঁর জীবিকা, পরিবার, নিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন রয়েছে। সেই স্বপ্নগুলোকে উপেক্ষা করে কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার সাফল্য সম্পূর্ণভাবে মূল্যায়ন করা যায় না।
রাজনীতি চলবে, মতপার্থক্য থাকবে এবং ক্ষমতার পরিবর্তনও ঘটতে পারে। কিন্তু এসব পরিবর্তনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনে ইতিবাচক অগ্রগতি হচ্ছে কি না, সেটিই হওয়া উচিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়নের বিষয়। জনগণের কষ্টকে রাজনৈতিক বক্তব্যের উপকরণ না বানিয়ে বাস্তব সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন।
আমরা এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি চাই, যেখানে মানুষের অধিকার দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে গুরুত্ব পাবে; যেখানে ক্ষমতার সঙ্গে জবাবদিহিও থাকবে; যেখানে তরুণেরা কাজের সুযোগ পাবে এবং সাধারণ পরিবার সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারবে।
শেষ প্রশ্নটি তাই থেকেই যায়—বাংলাদেশের রাজনীতি কি জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার হবে, নাকি সাধারণ মানুষ বারবার রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মূল্য দিয়ে যাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতে নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা, নাগরিকদের সচেতনতা এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সম্মিলিত দায়িত্ব। কারণ দেশটি সবার, আর জনগণের কল্যাণই হওয়া উচিত রাজনীতির মূল লক্ষ্য।
