মানুষ ঘুমায় কেন? ঘুমের সময় শরীরে আসলে কী ঘটে?
দিন শেষে আমরা যখন বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করি, তখন মনে হয় শরীর ও মস্তিষ্ক যেন সব কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু সত্যিই কি ঘুমের সময় আমাদের শরীর কিছু করে না?
আসলে বিষয়টি একেবারেই উল্টো।
আমরা ঘুমিয়ে থাকলেও মস্তিষ্ক তখনও সক্রিয় থাকে। শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া চলতে থাকে, স্মৃতি গঠনের কাজ হয়, শরীর নিজেকে পুনরুদ্ধার করে এবং পরের দিনের জন্য মস্তিষ্ক ও শরীর প্রস্তুত হতে থাকে। ঘুম মানুষের জীবনের এত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ যে পর্যাপ্ত ও ভালো মানের ঘুমের অভাব আমাদের চিন্তা, মনোযোগ, শেখা, কাজের ক্ষমতা এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—মানুষ ঘুমায় কেন? ঘুমের সময় শরীরে আসলে কী ঘটে? স্বপ্ন কেন দেখি? আর প্রতিদিন কত ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন?
চলুন বিষয়টি সহজ ভাষায় জানা যাক।
ঘুম আসলে কী?
ঘুম হলো শরীরের একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। এটি শুধু বিশ্রাম নেওয়া নয়। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক এবং শরীরের বিভিন্ন অংশ নির্দিষ্ট ধাপে কাজ করে।
বিজ্ঞানীরা ঘুমকে মূলত দুই ধরনের পর্যায়ে ভাগ করেন:
– Non-REM sleep
– REM sleep
এক রাতের ঘুমে মানুষ বারবার এই পর্যায়গুলোর মধ্য দিয়ে যায়। একটি পূর্ণ ঘুমের চক্র সাধারণত প্রায় ৮০ থেকে ১০০ মিনিট স্থায়ী হতে পারে এবং একজন মানুষ রাতে কয়েকটি ঘুমের চক্র অতিক্রম করতে পারে।
অর্থাৎ, আমরা আট ঘণ্টা ঘুমালেও পুরো আট ঘণ্টা একই ধরনের ঘুমের মধ্যে থাকি না।
মানুষ ঘুমায় কেন?
মানুষ কেন ঘুমায়—এর একটিমাত্র কারণ নেই। ঘুম শরীর ও মস্তিষ্কের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে জড়িত।
ঘুমের মাধ্যমে মস্তিষ্ক নতুন তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও স্মৃতি গঠনে সহায়তা পায়। একই সঙ্গে শরীরের বিভিন্ন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের সুযোগ পায়। পর্যাপ্ত ঘুম শেখা, মনোযোগ, চিন্তা এবং দৈনন্দিন কর্মক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সহজভাবে বললে, ঘুম হলো শরীরের দৈনিক রক্ষণাবেক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।
যেমন একটি গাড়িকে দীর্ঘদিন চালালে সার্ভিসিং প্রয়োজন হয়, তেমনি আমাদের শরীর ও মস্তিষ্কেরও নিয়মিত ঘুম প্রয়োজন।
ঘুমানোর সময় মস্তিষ্ক কি পুরোপুরি বন্ধ থাকে?
না।
এটি ঘুম সম্পর্কে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি।
ঘুমের সময় মস্তিষ্কের কার্যকলাপের ধরন পরিবর্তিত হয়। কখনো মস্তিষ্কের কার্যকলাপ ধীর হয়, আবার REM ঘুমের সময় মস্তিষ্ক তুলনামূলকভাবে সক্রিয় থাকে। এই পর্যায়ে স্বপ্নও বেশি দেখা যেতে পারে।
অর্থাৎ আমরা বাইরে থেকে নিশ্চুপ থাকলেও ভেতরে অনেক কিছুই ঘটতে থাকে।
ঘুমের প্রথম ধাপ: আমরা যখন ঘুমাতে শুরু করি
বিছানায় যাওয়ার পর প্রথমে আমরা জেগে থাকা অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে ঘুমের দিকে চলে যাই।
এই পর্যায়ে হৃদস্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাস ধীরে আসতে শুরু করে এবং পেশি শিথিল হয়। এটি মূলত জেগে থাকা ও ঘুমের মধ্যবর্তী একটি পরিবর্তনের পর্যায়।
এই সময় সামান্য শব্দ বা নড়াচড়াতেও অনেকের ঘুম ভেঙে যেতে পারে।
দ্বিতীয় ধাপ: হালকা ঘুম
এরপর আমরা আরও গভীর ঘুমের দিকে যাই।
এই পর্যায়ে শরীরের তাপমাত্রা কমতে থাকে, হৃদস্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাস আরও ধীর হয় এবং মস্তিষ্কের কার্যকলাপের ধরন পরিবর্তিত হয়।
রাতের ঘুমের একটি বড় অংশ এই পর্যায়ের ঘুমে কাটতে পারে।
তৃতীয় ধাপ: গভীর ঘুম
এরপর আসে গভীর ঘুম।
এই পর্যায়কে অনেক সময় শরীরের পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে দেখা হয়। এই সময়ে হৃদস্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাস আরও ধীর হয় এবং শরীরের টিস্যু পুনরুদ্ধার, শক্তি পুনরায় তৈরি করা এবং কিছু হরমোন নিঃসরণের মতো প্রক্রিয়া ঘটে।
রাতের প্রথম দিকে সাধারণত গভীর ঘুমের সময় বেশি থাকে। রাত যত এগোয়, গভীর ঘুমের সময় কমতে থাকে।
REM ঘুম কী?
REM-এর পূর্ণ অর্থ হলো Rapid Eye Movement।
এই পর্যায়ে চোখের দ্রুত নড়াচড়া দেখা যায় এবং মস্তিষ্কের কার্যকলাপ জেগে থাকার সময়ের সঙ্গে কিছুটা মিল দেখাতে পারে। এই পর্যায়েই সাধারণত সবচেয়ে জীবন্ত বা স্পষ্ট স্বপ্ন দেখা যায়।
রাতের প্রথম দিকে REM ঘুম তুলনামূলক কম হলেও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর সময় দীর্ঘ হতে থাকে।
আমরা স্বপ্ন দেখি কেন?
স্বপ্ন মানুষের ঘুমের অন্যতম রহস্যময় বিষয়।
বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি কেন মানুষ স্বপ্ন দেখে। REM ঘুমে স্বপ্ন বেশি স্পষ্ট হতে পারে, তবে Non-REM ঘুমেও স্বপ্ন দেখা সম্ভব।
ঘুমের সময় মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে নানা ধরনের কার্যকলাপ চলতে থাকে। দিনের ঘটনা, স্মৃতি, অনুভূতি এবং বিভিন্ন চিন্তার সঙ্গে স্বপ্নের সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে প্রতিটি স্বপ্নের নির্দিষ্ট অর্থ আছে—এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
ঘুমের সঙ্গে স্মৃতির সম্পর্ক
আপনি সারাদিন নতুন কিছু শিখলেন—কোনো নতুন বিষয় পড়লেন, কাজ শিখলেন বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মনে রাখার চেষ্টা করলেন।
এরপর রাতে ঘুমালেন।
ঘুমের সময় মস্তিষ্ক নতুন তথ্য ও স্মৃতিকে প্রক্রিয়াকরণের কাজে যুক্ত থাকে। ভালো ঘুম শেখা, তথ্য মনে রাখা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তাই পরীক্ষার আগে শুধু রাত জেগে পড়াশোনা করাই সবসময় ভালো কৌশল নয়। পড়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুমও গুরুত্বপূর্ণ।
ঘুম কম হলে কী হয়?
এক রাত কম ঘুমালেই সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের সমস্যা হবে—এমন নয়। তবে পর্যাপ্ত বা ভালো মানের ঘুম না হলে স্বল্পমেয়াদে ঘুমঘুম ভাব, মনোযোগের সমস্যা, বিরক্তি, ধীর প্রতিক্রিয়া এবং কাজের সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতি থাকলে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
গবেষণাভিত্তিক NIH তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের ঘাটতি হৃদ্স্বাস্থ্য, বিপাকীয় প্রক্রিয়া, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, ওজন এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
ঘুম কম হলে মস্তিষ্কে কী সমস্যা হয়?
ঘুমের ঘাটতি হলে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
এছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া, সমস্যা সমাধান, শেখা, স্মৃতি এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে প্রতিক্রিয়ার সময় ধীর হতে পারে এবং ভুল করার প্রবণতা বাড়তে পারে।
এ কারণে ঘুমের অভাব শুধু ব্যক্তিগত অস্বস্তির বিষয় নয়; গাড়ি চালানো বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সময় এটি নিরাপত্তার বিষয়ও হতে পারে।
ঘুম ও শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা
ঘুমের সঙ্গে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থারও সম্পর্ক রয়েছে।
NIH-এর তথ্য অনুযায়ী, পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমে পরিবর্তন আসতে পারে এবং সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিক্রিয়ায় প্রভাব পড়তে পারে।
তাই ঘুমকে শুধু ক্লান্তি দূর করার বিষয় হিসেবে দেখলে ঘুমের গুরুত্বকে ছোট করে দেখা হয়।
ঘুম ও ক্ষুধার সম্পর্ক
ঘুমের সঙ্গে শরীরের ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনেরও সম্পর্ক রয়েছে।
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ক্ষুধা ও পেট ভরা থাকার অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত হরমোনের ভারসাম্যে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। এর ফলে বেশি খাবার খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
এই কারণেই নিয়মিত কম ঘুমানো মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও ওজনের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
ঘুমের সঙ্গে শরীরের ঘড়ির সম্পর্ক
আমাদের শরীরের ভেতরে একটি প্রাকৃতিক সময়-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে, যাকে Circadian Rhythm বা সার্কাডিয়ান রিদম বলা হয়।
এটি প্রায় ২৪ ঘণ্টার একটি চক্র অনুসরণ করে এবং আলো-অন্ধকারসহ পরিবেশের বিভিন্ন সংকেতের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়।
দিনের আলো আমাদের মস্তিষ্ককে জাগ্রত থাকার সময় সম্পর্কে সংকেত দেয়। অন্যদিকে অন্ধকারের সময় শরীর ঘুমের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।
মেলাটোনিন কী?
মেলাটোনিন একটি হরমোন, যা শরীরের ঘুম-জাগরণ চক্রের সঙ্গে সম্পর্কিত।
অন্ধকারের সময় শরীরে মেলাটোনিনের নিঃসরণ বাড়তে পারে এবং এটি শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করে। রাতে অতিরিক্ত উজ্জ্বল কৃত্রিম আলো এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাধা দিতে পারে।
তাই ঘুমানোর ঠিক আগে দীর্ঘ সময় উজ্জ্বল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা কিছু মানুষের ঘুম আসতে দেরি হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
রাতে মোবাইল ব্যবহার করলে ঘুমে সমস্যা হয় কেন?
বর্তমান সময়ে ঘুমের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো রাতের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার।
মোবাইল, কম্পিউটার বা টেলিভিশনের উজ্জ্বল আলো শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের সংকেতকে প্রভাবিত করতে পারে। পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়া, ভিডিও, গেম বা নানা ধরনের তথ্য মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে।
ফলে বিছানায় যাওয়ার পরও ঘুম আসতে দেরি হতে পারে।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কত ঘণ্টা ঘুম দরকার?
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণভাবে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুমের সুপারিশ করা হয়। তবে বয়স, ব্যক্তিভেদে প্রয়োজন এবং ঘুমের মান অনুযায়ী প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে।
শুধু ঘুমের সময় কত ঘণ্টা ছিল সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়। ঘুম কতটা নিয়মিত এবং মানসম্মত ছিল সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
উদাহরণ হিসেবে, কেউ আট ঘণ্টা বিছানায় থাকলেও যদি বারবার ঘুম ভেঙে যায়, তাহলে সে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নাও পেতে পারে।
বেশি ঘুমালেই কি বেশি ভালো?
ঘুমের ক্ষেত্রে শুধু বেশি সময় মানেই বেশি উপকার—এমন ধারণা ঠিক নয়।
শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত ঘুম বা ঘুমের সমস্যার পেছনে অন্য কারণ থাকতে পারে। তাই দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক ঘুমের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যুক্তিযুক্ত।
ভালো ঘুমের জন্য কী করা যায়?
ভালো ঘুমের জন্য কিছু সাধারণ অভ্যাস কাজে লাগতে পারে।
১. প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমাতে যান
প্রতিদিন ঘুমানোর সময় খুব বেশি পরিবর্তন না করলে শরীরের ঘড়ি একটি নিয়মিত ছন্দে থাকতে সাহায্য করতে পারে।
২. ঘুমানোর আগে মোবাইল কম ব্যবহার করুন
বিশেষ করে ঘুমানোর ঠিক আগে দীর্ঘ সময় সোশ্যাল মিডিয়া, ভিডিও বা গেমে ব্যস্ত না থাকাই ভালো।
৩. ঘুমের পরিবেশ আরামদায়ক রাখুন
অন্ধকার, শান্ত এবং আরামদায়ক পরিবেশ অনেকের ঘুমের জন্য সহায়ক হতে পারে।
৪. সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলুন
চা, কফি বা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় কিছু মানুষের ঘুমে প্রভাব ফেলতে পারে।
৫. দিনের বেলায় শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন
নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ এবং ঘুমের অভ্যাসের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
৬. বিছানাকে শুধু ঘুমের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করুন
বিছানায় দীর্ঘ সময় মোবাইল দেখা বা কাজ করার অভ্যাস থাকলে মস্তিষ্কের কাছে বিছানা ও ঘুমের স্বাভাবিক সম্পর্ক দুর্বল হতে পারে।
রাতে ঘুম না এলে কী করবেন?
মাঝেমধ্যে ঘুম আসতে দেরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু নিয়মিত এমন হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
ঘুমের সমস্যা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে বা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব, নাক ডাকা ও শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা থাকলে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সঙ্গে কথা বলা ভালো। কারণ কিছু ক্ষেত্রে ঘুমের পেছনে নির্দিষ্ট sleep disorder থাকতে পারে।
কেন কেউ রাতে সহজে ঘুমায় আর কেউ ঘুমাতে পারে না?
এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।
মানসিক চাপ, অনিয়মিত ঘুমের সময়, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার, পরিবেশ, ক্যাফেইন, কাজের সময়সূচি এবং শরীরের স্বাভাবিক circadian rhythm—সবকিছু ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
রাতের শিফটে কাজ করা মানুষের ক্ষেত্রে শরীরের স্বাভাবিক ঘড়ি এবং কাজের সময়ের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হওয়ায় ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ঘুম সম্পর্কে কয়েকটি চমকপ্রদ তথ্য
প্রথমত, ঘুমের সময় মস্তিষ্ক পুরোপুরি বন্ধ থাকে না।
দ্বিতীয়ত, আমরা রাতভর একই ধরনের ঘুমের মধ্যে থাকি না; ঘুম বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে বারবার চক্রাকারে চলে।
তৃতীয়ত, গভীর ঘুম রাতের প্রথম দিকে তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
চতুর্থত, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে REM ঘুমের সময় সাধারণত বৃদ্ধি পায়।
পঞ্চমত, স্বপ্ন শুধু REM ঘুমেই হয় না; Non-REM ঘুমেও স্বপ্ন দেখা সম্ভব।
ষষ্ঠত, ঘুমের সঙ্গে শেখা, স্মৃতি, মনোযোগ এবং শরীরের পুনরুদ্ধারের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
তাহলে ঘুম কি সময়ের অপচয়?
একদমই নয়।
অনেক মানুষ মনে করেন, বেশি কাজ করার জন্য ঘুম কমিয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে কাজের মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অর্থাৎ ঘুমকে কাজের শত্রু না দেখে কাজ করার সক্ষমতার একটি অংশ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
আপনি যদি প্রতিদিন ১৬ ঘণ্টা জেগে থাকেন কিন্তু ক্লান্ত মস্তিষ্ক দিয়ে কাজ করেন, তাহলে সেই অতিরিক্ত জেগে থাকা সময় সবসময় অতিরিক্ত উৎপাদনশীল সময়ে পরিণত নাও হতে পারে।
শেষ কথা
ঘুম আমাদের জীবনের সবচেয়ে সাধারণ অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক প্রক্রিয়াগুলোর একটি।
প্রতিদিন রাতে আমরা যখন চোখ বন্ধ করি, তখন পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ কিছু সময়ের জন্য কমে যায়। কিন্তু শরীরের ভেতরে তখনও গুরুত্বপূর্ণ কাজ চলতে থাকে। মস্তিষ্ক ঘুমের বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যায়, স্মৃতি ও শেখার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে এবং শরীর পুনরুদ্ধারের সুযোগ পায়।
তাই ঘুমকে অলসতা বলা ঠিক নয়। ঘুম হলো শরীর ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক প্রয়োজন।
ব্যস্ত জীবন, চাকরি, পড়াশোনা কিংবা মোবাইলের কারণে আমরা অনেক সময় ঘুমকে পিছিয়ে দিই। কিন্তু সুস্থভাবে দীর্ঘদিন কাজ করতে চাইলে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুমের গুরুত্ব মনে রাখা দরকার।
ভালো ঘুম মানে শুধু সকালে ঘুম থেকে ওঠা নয়—ভালো ঘুম মানে পরের দিনকে আরও ভালোভাবে শুরু করার জন্য শরীর ও মস্তিষ্ককে প্রস্তুত করা।
তথ্যসূত্র
– National Heart, Lung, and Blood Institute (NHLBI), NIH — Sleep এবং Sleep Stages.
– Eunice Kennedy Shriver National Institute of Child Health and Human Development (NICHD), NIH — Sleep.
– NHLBI, NIH — Why Sleep Is Important.
– NHLBI, NIH — Sleep Deprivation and Deficiency.
আরও পড়ুন: বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, জীবন ও প্রয়োজনীয় তথ্য নিয়ে আরও লেখা পড়তে Vibesrot.com ভিজিট করুন।
